ঘড়ির কাঁটা এগারোটার ঘর ছাড়ালেই রোমিলার মনে যেন রঙের ছোঁয়া লাগে। আর তো মাত্র ঘণ্টা দুয়েক, তারপরই......সে আসবে। ঝটপট হাতের কাজ সারতে থাকে রোমিলা। কতটুকুই বা পায় তাকে! দুপুরের খানিক সময় বই তো নয়! এক মুহূর্তও হারাতে চায় না সে। এই দুপুরটুকুর জন্যই তো সারা দিন রাতের অধীর আগ্রহে অপেক্ষা! তার আলুনি জীবনটা ওর উপস্থিতিতেই তো হয়ে উঠেছে মূল্যবান!
পুরো ব্যাপারটা বুঝতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে বেশ কয়েক বছর আগে। তখন রোমিলা ব্যস্ত সুগৃহিনী। অমর ও বুবুকে নিয়ে তার সুখের সংসার। দুজনেই রোমিলা ছাড়া অচল। ওদের দুজনকে সামলাতে সামলাতে কোথা দিয়ে যে সময় পালিয়ে যেত, বুঝতেই পারত না রোমিলা। সমস্যাটা শুরু হল বুবু বড় হয়ে যাওয়ার পর। পড়াশোনা শেষ করে বুবু ভিনরাজ্যে পাড়ি দিল চাকরির উদ্দেশ্যে। মনখারাপ, মেয়ের জন্য উদ্বেগ- এসব সামলে বেশ কদিন পর যখন থিতু হল রোমিলা, তখন দেখল তার সামনে পড়ে আছে লম্বা অবসর। ঘরের কাজ সেরে, টিভি দেখে, গান শুনেও সে কিছুতেই সময়টাকে খরচ করে উঠতে পারছিল না। অমরও ব্যস্ত তার অফিস, আড্ডা এসব নিয়ে। বউয়ের সঙ্গে বসে গল্প করার অভ্যাসই গড়ে ওঠেনি তার। মেয়ে নিয়ে ব্যস্ত থাকত বলে অমরের এই স্বভাবটা কোনদিন সমস্যায় ফেলেনি রোমিলাকে। কিন্তু মেয়ে চলে যাবার পর অমরের এই স্বভাবে সে অসহ্য হয়ে উঠল। প্রথম প্রথম অনুযোগও করত সে। বিয়ের এত বছর পর রোমিলার এমন অনুযোগে আশ্চর্য হয়ে গেল অমর," কি বলছ তুমি! আড্ডা, বন্ধুবান্ধব সব ছেড়ে দেব? অফিস থেকে সোজা তোমার কাছে এসে গল্প করতে হবে? কি অদ্ভুত কথা বলছ তুমি!" অমরের কথায় রোমিলাই লজ্জা পেয়ে গেল। অবশ্য অমর বুঝিয়েওছিল,"অত বড় স্মার্টফোনটা আছে কি করতে? নতুন নতুন রান্না শেখ, গল্প কবিতা লেখ- কত কি করার আছে! চেষ্টা কর!" চেষ্টা যে করেনি রোমিলা, তা নয়। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও তার লেখা দু' লাইনের বেশি এগোয়নি। হ্যাঁ, মাঝেমাঝে ফোনেই শেখা নতুন নতুন রান্নার ছবি পোস্ট করত সে। কিন্তু কদিন পরেই সবই একঘেয়ে লাগতে লাগল রোমিলার। মেয়েকে মাঝেমধ্যেই ফোন করে গল্প করতে চাইত সে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই চাকরি, বন্ধুবান্ধব নিয়ে ব্যস্ত বুবু মায়ের ডাকে অতটা আগ্রহ প্রকাশ করতে পারত না। সে ও মাকে উপদেশ দিয়েছিল, যাতে তার মা এই অবকাশে 'নিজস্ব জগত' গড়ে তোলে। রোমিলা পড়ল ভারি সমস্যায়। 'নিজস্ব জগত' বলে তার তো কিছুই ছিল না। 'নিজস্ব জগত'- ব্যাপারটা তার কাছে বড়ই অদ্ভূত! তার সমস্ত জগত তো সংসারকে ঘিরে, সংসারের মানুষগুলোকে ঘিরে। এতদিন তো এভাবেই ভেবে এসেছে সে। নতুন করে এই বয়সে এসে নতুন ভাবনা ভাবা কি সহজ কথা! কিন্তু পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করল 'নিজস্ব জগত' -এর খোঁজ করতে। খুঁজে খুঁজে সে পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করল। মাঝেমাঝেই তাদের সঙ্গে গল্পগুজব, দেখাসাক্ষাত আরম্ভ করল। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সে বুঝল, কোথায় যেন একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে। পুরোনো বন্ধুত্বের সেই নির্মলতা আজ যেন আর সেরকমটি নেই। কোথাও একটা তুলনা, রেষারেষি এসেই যাচ্ছে। তাদের জগতও আজ অনেকটাই আলাদা হয়ে গেছে। এরপর রোমিলা দুপুরে একা একাই শপিংমলে ঘুরতে যেতে শুরু করল। কিন্তু একা একা ঘোরা, খাওয়ার অভ্যাস কোনদিনই না থাকায় সেটিও সে বেশিদিন চালাতে পারল না। এভাবেই নানাভাবে চেষ্টা করেও কিছুতেই 'নিজস্ব জগত' -এর সন্ধান না পেয়ে প্রচণ্ড হতাশ হয়ে পড়ল রোমিলা। দিনে দিনে একাকীত্ববোধ ঘিরে ধরল তাকে। মনের মধ্যে হতাশা এসে বাসা বাঁধল। ফলস্বরূপ, হাসিখুশি রোমিলা ধীরে ধীরে খিটখিটে হয়ে যেতে লাগল। কথায় কথায় অমরের সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি, বুবুর সঙ্গে মন কষাকষি লেগেই থাকল। রোমিলার সমস্যাটা অমর বা বুবু - কেউই বুঝতে পারল না। বরং তারা মনে একরাশ অসন্তোষ নিয়ে অভিযোগ করল, রোমিলা পাল্টে গেছে। এর মারাত্মক প্রভাব পড়ল রোমিলার মনে। সে নিজেকে সংসারে উদ্বৃত্ত বলে ভাবতে শুরু করল। তার মনে হল সকলের কাছে তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। হতাশা এসে গ্রাস করল তাকে। কথাবার্তা বলাও সে প্রায় ছেড়েই দিল। এই সমস্ত সমস্যার জন্য দায়ী যে 'মধ্য বয়সের বিপন্নতা'- এটা না বুঝল রোমিলা নিজে, না বুঝতে চেষ্টা করল অমর বা বুবু। সংসারে এমনই হয় বোধহয়!
দিন কেটে যাচ্ছিল এভাবেই। কিন্তু রোমিলার জীবনটা এভাবে শেষ করে দেবার ইচ্ছে বোধহয় বিধাতার ছিল না। তাই রোমিলার জীবনে এল নতুন চমক। তার জীবনে আগমন ঘটল এক নতুন মানুষের যার ছোঁয়ায় রোমিলা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল হতাশা থেকে। নিজেকে আবার গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে শুরু করল, মনে আনন্দের ছোঁয়া লাগল, একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তি পেল।আজকাল রোমিলার স্বভাবেও এসেছে পরিবর্তন। আবার সে হাসিখুশি, অমরও খুশি, বুবুও নিশ্চিন্ত।আজকাল তাই অধীর আগ্রহে তার অপেক্ষা নির্জন দুপুরের। ঐ সময়ই তো সে আসে রোমিলার কাছে, প্রতিদিন গল্পে, আদরে তার নিঃসঙ্গ জীবনকে পূর্ণ করে তোলে।
টিং.....টং......টিং......টং.....টিং.....টং.... বেলটা বারবার বেজে ওঠে অধৈর্য স্বরে। দরজার ওপারের আগন্তুক যে আর অপেক্ষায় রাজি নয়, বেশ বোঝা যায়। এক ছুট্টে রোমিলা দরজা খুলতে যায়। দরজা খুলতেই আগন্তুক ঝাঁপিয়ে পড়ে রোমিলাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে। রোমিলাও তাকে বুকে চেপে আদর করে।
"রোমি-মা, রোমি-মা, জান, আজ ইস্কুলে কি হয়েছে! সোনি আমার টিফিন খেয়ে নিয়েছে, সিরিন না, আমাকে মেরেছে। আমি আন্টিকে বলে দিয়েছি......." কলকল করে অজস্র কথা বলে যায় ছোট্ট মানুষটি- বুবলি, পাশের বাড়িতে নতুন আসা পরিবারটির বছর পাঁচেকের ছোট্ট, মিষ্টি মেয়ে। রোমিলার জীবনে নতুন আলো এনে দিয়েছে ঐ পুঁচকে একরত্তি মেয়ে। বড্ড ভালবাসে সে তার রোমি-মাকে। ইস্কুল থেকে ফিরেই চলে আসে রোমিলার কাছে। রোমিলার কাছেই তার খাওয়া, গল্প, ঘুম। সন্ধ্যে নাগাদ বুবলির মা এসে তাকে নিয়ে যায়।
রোমিলা বুবলিকে কোলে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগোয়। কত কাজ তার এখন! বুবলিকে খাওয়ানো, গল্প বলা, ঘুম পাড়ানো। আবার নতুন উদ্যমে বাঁচতে শিখছে রোমিলা- বুবলির ছোট্ট ছোট্ট ভরসার হাত ধরে।
